প্রিন্ট এর তারিখ : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ মার্চ ২০২৬
পাহাড়ের কোলে এক খুমী মায়ের জীবন সংগ্রাম
ডেস্ক নিউজ, প্রতিদিনের বান্দরবান ||
বান্দরবানে ১১টি আদিবাসী জাতিসত্তার মধ্যে একটি খুমী সম্প্রদায়। দুই বছর আগে এ সম্প্রদায় থেকে প্রথম একজন নারী শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়।ওই শিক্ষার্থীর দুই ভাইও পড়াশোনা করছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বলে পরে জানা যায়। এবার তাদের আরেক বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পথে।সমাজের পিছিয়ে পড়া একটি পরিবারের চার সন্তানের এমন সাফল্যের পেছনে উঠে এসেছে এক মায়ের সংগ্রামী জীবনের কথা। পাহাড়ের গহীন এলাকায় থেকেও সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার দোড়গোড়ায় পৌঁছাতে নিরন্তর চেষ্টা করে গেছেন স্বামী হারানো এই নারী; লিংসাই খুমী যার নাম।অকালে স্বামীহারা হলেও শুধু সন্তানদের লেখাপড়ার করানোর মানসিক শক্তিতেই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। নিজে লেখাপড়া না জানলেও স্বামীর পেনশন, পারিবারিক বাগানের আয় এবং তাঁতে বুনন করা কাপড় বিক্রির টাকায় চার সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পেরেছেন তিনি।তার গ্রামের বাড়ি বান্দরবানে রোয়াংছড়ি উপজেলা তারাছা ইউনিয়নের মংঞো পাড়ায়। শহরের সঙ্গে কোনো সড়ক যোগাযোগ নেই। শহর থেকে সাঙ্গু নদীর উজানে ইঞ্জিন নৌকায় করে যেতে হয়, সময় লাগে দুই ঘণ্টা। নৌকা থেকে নেমে আধঘণ্টা পাহাড় বেয়ে ওঠার পর যাওয়া যায় সেই গ্রামে।লিংসাই খুমীর স্বামী নয়লো খুমী ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ১২ বছর আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। হঠাৎ করে অন্ধকার নেমে আসে তাদের সংসারে। পিঠাপিঠি চার সন্তান সবাই পড়াশোনা করছে। সম্বল বলতে ছিল স্বামীর লাগানো আম ও সেগুন গাছের বাগান। কিন্তু সেগুলো তখনো বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠেনি।তবে লিংসাইয়ের ছিল কোমর তাঁত বুননের অভিজ্ঞতা। এটাকে পুঁজি করে সন্তানদের লেখাপড়া করানোর চিন্তা করে সেই এক যুগ আগে বান্দরবান শহরে চলে আসেন তিনি।পার্বত্য চট্টগ্রামে ভাষা ও জাতিগতভাবে কম জনসংখ্যার মধ্যে খুমীরা অন্যতম। বান্দরবানে রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি- এই তিন উপজেলায় তাদের বসবাসও গহীন পাহাড়ের দুর্গম এলাকায়। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী খুমীদের জনসংখ্যা তিন হাজার ৯৯৪ জন।তথ্য মতে, এ সম্প্রদায় থেকে এখনও পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি পরিবার শহরে এসে বসবাস করে। তার মধ্যে একটা এই লিংসাই খুমীর পরিবার।লিংসাইয়ের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে সুইতং খুমী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছেন। তিনি উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেছেন লামা কোয়ান্টাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে।আরেক ছেলে তংলো খুমী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগে অনার্স চূড়ান্ত বর্ষে অধ্যয়নরত। তিনি বান্দরবান কালেক্টর স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি এবং রাজধানীর নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন।মেয়েদের মধ্যে বড় তংসই খুমী হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন।তাদের সবার ছোট রিংসই খুমী চট্টগ্রামে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে ভর্তির আবেদন করেছেন। চলতি মাসেই ফলাফল দেওয়ার কথা। তিনি এইচএসসি পাস করেছেন ঢাকার সেন্ট যোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে।লিংসাই খুমীর পরিবার থাকে বান্দরবান জেলা শহরে উজানি পাড়ার চেয়ারম্যান গলির একটা বাসার নিচতলায়। মাসিক চার হাজার টাকা ভাড়ায় তিন কক্ষের ছোট বাসাটির একটি কক্ষে তাঁত বুননের যন্ত্রপাতি। সেখানে লিংসাই খুমী থাকেন। বাকি দুটি কক্ষে ছেলেমেয়েরা এলে থাকেন।এত অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে সন্তানদের কীভাবে লেখাপড়া করালেন জানতে চাইলে লিংসাই খুমী বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার পর তার পেনশন ও কল্যাণ ভাতার টাকা পাই, তা দিয়ে বাসা ভাড়া এবং বাজার খরচ হয়।“এছাড়া গ্রামে তিনটি আমের বাগান আছে। স্বামী থাকতে প্রত্যেক বছর ২০০ মণের মত আম পাওয়া যেত। এখন এত পরিমাণে পাওয়া যায় না। এর বাইরে সেগুন বাগান আছে। হঠাৎ করে বেশি টাকা প্রয়োজন হলে সেগুন গাছ কেটে বিক্রি করি। যেগুলো বড় হয়েছে সেগুলো কাটা হয় মূলত।”তবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া এবং সংসার খরচের একটা অংশ তাঁতের কাপড় বুনন থেকে আসে বলে জানান তিনি।লিংসাই বলেন, “আমাদের খুমীদের বিভিন্ন পোশাক তৈরি করে থাকি। তবে এগুলো বানাতে বেশি সময় লাগে। বিয়ে-শাদি কিংবা উৎসব-অনুষ্ঠানের পোশাক বানাতে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগে। সেখানে কিছু সূক্ষ্ম কাজ থাকে। কুঁচি দিতে আড়াই মাস চলে যায়। আর সাধারণ ঘরে পরার পোশাক বানাতে গেলে ১৫ দিনের মধ্যে হয়ে যায়।”উৎসব-পার্বণে পরার পোশাক সাধারণত নয় হাজার টাকায় এবং ঘরে পরার পোশাক তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেন বলে জানান তিনি।ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া প্রসঙ্গে সংগ্রামী এই নারী বলেন, “ছোট থাকতে দুইজন দুয়েকবার ফেল করেছিল। কিন্তু বড় হওয়ার পর কোথাও আটকে থাকেনি। কেউ কোনো ক্লাসে আর ফেল করেনি। সবাই এখনও লেখাপড়া করছে। তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারলে আমার জীবনে যত কষ্ট আর পরিশ্রম ছিল সার্থক হবে।”তার বড় ছেলে সুইতং খুমী বলেন, “আমার মা তো লেখাপড়া জানতেন না। কিন্তু আমাদের লেখাপড়ার প্রতি সবসময় খুব সিরিয়াস ছিলেন। মায়ের হয়ত কোনো কোনো সময় টাকা-পয়সা ছিল না। ধারদেনা করে হলেও আমাদের লেখাপড়া করিয়েছেন। এ কারণে মাকে নিয়ে সবসময় গর্ব করি।“আমাদের বংশে লেখাপড়া জানা মানুষের সংখ্যা কম। আমাদের নিজেদেরও প্রচেষ্টা ছিল লেখাপড়াটা ভালভাবে করার। একদিকে আমরা মায়ের সুনাম রাখব। অন্যদিকে নিজেদের জাতিসত্তার প্রতিনিধিত্বও করতে পারব।”খুমী সোশ্যাল কাউন্সিলের সভাপতি সি অং খুমী বলেন, “আমাদের পাড়া থেকে এখনও পর্যন্ত পাঁচজন খুমী শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। এর মধ্যে লিংসাই খুমীর এক পরিবারেই তিনজন রয়েছে।”পরিবারটি আগে থেকে লেখাপড়ায় সচেতন জানিয়ে তিনি বলেন, “লিংসাই খুমীর স্বামী আত্মীয়তা সম্পর্কে আমার জ্যাঠাত ভাই হয়। তিনি ১৯৯৮ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। আমাদের খুমী সম্প্রদায়ের সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন তিনি।“পরে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক হয়েছিলেন। সামাজিক সংগঠন খুমী সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা তিনজনের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। আমি নিজেও লেখাপড়া করেছি সেই জ্যাঠাত ভাইয়ের উৎসাহ-সহযোগিতায়।”খুমী সোশ্যাল কাউন্সিলের উপদেষ্টা লেলুং খুমী বলেন, “লিংসাই খুমীর সংগ্রাম আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা। আদিবাসীদের অনেকেই শহরে থেকে লেখাপড়া করার ভালো সুযোগ-সুবিধা পেয়েও উচ্চ শিক্ষায় যেতে পারে না। সেখানে লিংসাই খুমী একেবারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজন নারী হয়ে চার ছেলেমেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় নিয়ে যেতে পেরেছেন। এখানেই তিনি ব্যতিক্রম।”
প্রতিদিনের বান্দরবান
কপিরাইট © ২০২৬ প্রতিদিনের বান্দরবান । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত