বান্দরবানের লামা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সমাজবিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক মুহাম্মদ নবীর উদ্দিনের বিরুদ্ধে ভয়াবহ ‘প্রাইভেট বাণিজ্য’ ও শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। যারা তার কাছে প্রাইভেট পড়তে রাজি হচ্ছে না, তাদের পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়া এবং ক্লাসে নানাভাবে হেনস্তা করার হুমকি দিচ্ছেন তিনি। নিজ বাড়িতে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ানোর নামে জিম্মি করে রেখেছেন বলেও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষক মুহাম্মদ নবীর উদ্দিন মাদ্রাসায় ক্লাসের চেয়ে নিজের বাসায় কোচিং করানোর দিকেই বেশি মনোযোগী। তিনি প্রায়ই শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে নিজের বাসায় প্রাইভেট পড়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। তার এই বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটের মধ্যে স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি লামা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ যুক্ত রয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ওই মাদ্রাসার ভোকেশনাল শাখা। প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হলেও এর ভোকেশনাল শাখাটি অদ্যাবধি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এর যাবতীয় দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এককভাবে শিক্ষক মোহাম্মদ নবীর উদ্দিনের হাতে। এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়েই তিনি শিক্ষার্থীদের ওপর নিজের আধিপত্য বিস্তার করছেন।
ভোকেশনাল শাখার ১০০ নম্বরের পরীক্ষার মান বণ্টনে তাত্ত্বিক পরীক্ষায় ৬০ এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নে ৪০ নম্বর নির্ধারিত রয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, এই ‘৪০ নম্বর’ এখন শিক্ষক মুহাম্মদ নবীর উদ্দিনের হাতে একটি অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে শিক্ষার্থীরা তার কাছে প্রাইভেট পড়তে অস্বীকার করে, তাদের ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বরে ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেওয়া হয়। এতে মেধাবী শিক্ষার্থীরাও চূড়ান্ত ফলাফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অভাবের সংসারে মাদ্রাসার বেতন জোগাতে হিমশিম খাওয়া নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো শিক্ষকের এমন 'বাণিজ্যিক' মানসিকতায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাড়তি উপার্জনের নেশায় ওই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নিজের বাড়িতে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের অভিযোগ, আর্থিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকের নির্দেশ অমান্য করার সাহস নেই কারও। তাদের ভাষ্যমতে, বাধ্য হয়েই এই বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।
ক্ষুব্ধ এক অভিভাবক বলেন, "সংসারের খরচ চালানোই যেখানে দায়, সেখানে মাদ্রাসার বেতনের বাইরে শিক্ষকের বাড়িতে আলাদা খরচ বহন করা আমাদের মতো নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য অসম্ভব। কিন্তু ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এবং শিক্ষকের ভয়ে আমরা মুখ খুলতে পারছি না।"
ভুক্তভোগী আরেক অভিভাবক একই উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, "শিক্ষকের নির্দেশ মানেই তা মেনে নেওয়া। ছেলের পড়াশোনা বা পরীক্ষার ফলাফলের কথা ভেবে আমরা ভয়ে চুপ থাকতে বাধ্য হচ্ছি।"
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাসে পড়ানোর চেয়ে প্রাইভেট পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের প্রতি ওই শিক্ষক বেশি মনোযোগী। ফলে যারা প্রাইভেট পড়ছে না, তারা মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ার ভয়ে চাপে থাকছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিম্নবিত্ত অভিভাবকদের ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা চাপছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ এবং পরবর্তীতে ২০১৯ সালে প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী: কোনো শিক্ষক তার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত কোচিং করাতে পারবেন না। প্রতিষ্ঠান প্রধানের লিখিত অনুমতি সাপেক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে পড়ানো যাবে। বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার খোলা বা এর সঙ্গে যুক্ত থাকা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
অভিযুক্ত শিক্ষক মুহাম্মদ নবীর উদ্দিনের কর্মকাণ্ড এই নীতিমালার প্রতিটি ধারাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে। নীতিমালা অনুযায়ী, এর শাস্তি হিসেবে এমপিও স্থগিত, বেতন-ভাতা হ্রাস, এমনকি চূড়ান্ত বরখাস্ত পর্যন্ত করার বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষক মুহাম্মদ নবীর উদ্দিনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে বলেন, “ফোনে এ নিয়ে কিছু বলব না, মাদ্রাসায় আসেন, সরাসরি দেখা করে কথা বলেন।”
একই বিষয়ে লামা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা মো. আবু তৈয়বের কাছে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন এবং কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬
বান্দরবানের লামা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সমাজবিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক মুহাম্মদ নবীর উদ্দিনের বিরুদ্ধে ভয়াবহ ‘প্রাইভেট বাণিজ্য’ ও শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। যারা তার কাছে প্রাইভেট পড়তে রাজি হচ্ছে না, তাদের পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়া এবং ক্লাসে নানাভাবে হেনস্তা করার হুমকি দিচ্ছেন তিনি। নিজ বাড়িতে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ানোর নামে জিম্মি করে রেখেছেন বলেও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষক মুহাম্মদ নবীর উদ্দিন মাদ্রাসায় ক্লাসের চেয়ে নিজের বাসায় কোচিং করানোর দিকেই বেশি মনোযোগী। তিনি প্রায়ই শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে নিজের বাসায় প্রাইভেট পড়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। তার এই বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটের মধ্যে স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি লামা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ যুক্ত রয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ওই মাদ্রাসার ভোকেশনাল শাখা। প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হলেও এর ভোকেশনাল শাখাটি অদ্যাবধি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এর যাবতীয় দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এককভাবে শিক্ষক মোহাম্মদ নবীর উদ্দিনের হাতে। এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়েই তিনি শিক্ষার্থীদের ওপর নিজের আধিপত্য বিস্তার করছেন।
ভোকেশনাল শাখার ১০০ নম্বরের পরীক্ষার মান বণ্টনে তাত্ত্বিক পরীক্ষায় ৬০ এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নে ৪০ নম্বর নির্ধারিত রয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, এই ‘৪০ নম্বর’ এখন শিক্ষক মুহাম্মদ নবীর উদ্দিনের হাতে একটি অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে শিক্ষার্থীরা তার কাছে প্রাইভেট পড়তে অস্বীকার করে, তাদের ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বরে ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেওয়া হয়। এতে মেধাবী শিক্ষার্থীরাও চূড়ান্ত ফলাফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অভাবের সংসারে মাদ্রাসার বেতন জোগাতে হিমশিম খাওয়া নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো শিক্ষকের এমন 'বাণিজ্যিক' মানসিকতায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাড়তি উপার্জনের নেশায় ওই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নিজের বাড়িতে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের অভিযোগ, আর্থিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকের নির্দেশ অমান্য করার সাহস নেই কারও। তাদের ভাষ্যমতে, বাধ্য হয়েই এই বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।
ক্ষুব্ধ এক অভিভাবক বলেন, "সংসারের খরচ চালানোই যেখানে দায়, সেখানে মাদ্রাসার বেতনের বাইরে শিক্ষকের বাড়িতে আলাদা খরচ বহন করা আমাদের মতো নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য অসম্ভব। কিন্তু ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এবং শিক্ষকের ভয়ে আমরা মুখ খুলতে পারছি না।"
ভুক্তভোগী আরেক অভিভাবক একই উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, "শিক্ষকের নির্দেশ মানেই তা মেনে নেওয়া। ছেলের পড়াশোনা বা পরীক্ষার ফলাফলের কথা ভেবে আমরা ভয়ে চুপ থাকতে বাধ্য হচ্ছি।"
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাসে পড়ানোর চেয়ে প্রাইভেট পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের প্রতি ওই শিক্ষক বেশি মনোযোগী। ফলে যারা প্রাইভেট পড়ছে না, তারা মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ার ভয়ে চাপে থাকছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিম্নবিত্ত অভিভাবকদের ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা চাপছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ এবং পরবর্তীতে ২০১৯ সালে প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী: কোনো শিক্ষক তার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত কোচিং করাতে পারবেন না। প্রতিষ্ঠান প্রধানের লিখিত অনুমতি সাপেক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে পড়ানো যাবে। বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার খোলা বা এর সঙ্গে যুক্ত থাকা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
অভিযুক্ত শিক্ষক মুহাম্মদ নবীর উদ্দিনের কর্মকাণ্ড এই নীতিমালার প্রতিটি ধারাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে। নীতিমালা অনুযায়ী, এর শাস্তি হিসেবে এমপিও স্থগিত, বেতন-ভাতা হ্রাস, এমনকি চূড়ান্ত বরখাস্ত পর্যন্ত করার বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষক মুহাম্মদ নবীর উদ্দিনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে বলেন, “ফোনে এ নিয়ে কিছু বলব না, মাদ্রাসায় আসেন, সরাসরি দেখা করে কথা বলেন।”
একই বিষয়ে লামা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা মো. আবু তৈয়বের কাছে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন এবং কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আপনার মতামত লিখুন