প্রতিদিনের বান্দরবান

পার্বত্যমন্ত্রীর পোষ্টে অসাংবিধানিক ‘আদিবাসী’ শব্দ প্রচারণা, পাহাড়ে উৎসবের আমেজে শঙ্কার বার্তা!



পার্বত্যমন্ত্রীর পোষ্টে অসাংবিধানিক ‘আদিবাসী’ শব্দ প্রচারণা, পাহাড়ে উৎসবের আমেজে শঙ্কার বার্তা!
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি ঢাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উৎসব বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান ও চাংলান উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভা সংক্রান্ত মাননীয় পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এর ফেসবুক পেইজে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’র স্থলে ‘আদিবাসী’ শব্দ লিখা হয়। কিন্তু ‘আদিবাসী’ শব্দটি দেশের সংবিধান পরীপন্থী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতার আলোকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় এ নিয়ে পাহাড়ের মানুষের কাছে উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে মাননীয় মন্ত্রীর পোষ্টে এমন শব্দচয়ন অনিচ্ছাকৃত ভুল কিনা সেটাও ভাবছেন অনেকে। 

দেশের সংবিধান, বিভিন্ন আইন ও দপ্তরে 'উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী' শব্দই স্বীকৃত। তাছাড়া ঐতিহাসিক ভাবে  উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীই তাদের প্রকৃত পরিচয়। তাই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তির বক্তব্যে ব্যবহৃত শব্দচয়ন সংবিধান ও আইনসম্মত হওয়া জরুরি, কারণ এ ধরনের শব্দ রাষ্ট্রীয় নীতির বার্তা বহন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে এমন বিতর্কিত ও অসাংবিধানিক শব্দ রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ফেসবুকে প্রচারণা করা জাতির জন্য শুভ বার্তা বহন করে না। বরং তা বিভাজন ও অনৈক্যের বার্তা দেয়।

বাংলাদেশের সংবিধানে ও রাষ্ট্রীয়ভাবে উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং আদিবাসী শব্দচয়নে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন’। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাধারণ অংশের ১নং ধারা থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে অসংখ্যবার ‘উপজাতি’ উল্লেখ করে তাদের জাতিগত পরিচয় পরিষ্কার করা হয়েছে। তাই অন্য কোনো উড়ে এসে জোড়ে বসা শব্দ কারো পরিচয় বহনের পরিবর্তে পাহাড়ে বিভাজন ও অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত করে।

গত পরশুদিন মাননীয় পার্বত্যমন্ত্রী পাহাড়ী জনগোষ্ঠীকে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ উল্লেখ করে পাহাড়ের মানুষের কাছে ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জন বার্তা প্রদান করলেও আজকে মন্ত্রীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে বিতর্কিত আদিবাসী শব্দ প্রচারণা করাটা হতাশাজনক। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে শব্দচয়নে অসতর্কতা ভুল বোঝাবুঝি বাড়াতে পারে যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে ভূমিকা রাখে; তাই ঐক্য, সংলাপ ও সম্প্রীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তাই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তির শব্দচয়নে সতর্কতা অবলম্বন ও প্রচলিত আইনের দিকে সুদৃষ্টি রাখা অবশ্যই জরুরী।

অন্যদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সামাজিক উৎসব উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা বার্তায় সংবিধান ও আইনসম্মত ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দ এবং সবাই বাংলাদেশী হিসেবে উল্লেখ করে পার্বত্যবাসীকে আশার বার্তা দিয়েছেন। মন্ত্রীর পোষ্টে এমন বিতর্কিত শব্দ উচ্চারণ পাহাড়ের মানুষের মনে ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। তাই পাহাড়ের সকল মানুষের চাওয়া, রাষ্ট্রীয় পদে থাকা যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কথা, ব্ক্তব্য ও কাজে সংবিধানসম্মত, দায়িত্বশীল ও ঐক্যের বার্তা বহন করে এমন শব্দ উচ্চারণ অত্যন্ত জরুরী। অন্যথায় তা বিভাজন ও অনৈক্যের পথ সুগম করে দেয়। 

একজন দায়িত্বশীল ও পাহাড়ের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তির কাছে বিভাজনমূলক ও বিতর্কিত শব্দের পরিবর্তে আইনসম্মত ও দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রত্যাশা করে পাহাড়ের জনগণ। তাই অবিলম্বে পার্বত্য মন্ত্রীর ফেসবুক পোষ্টে উল্লেখিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিবর্তে ব্যবহৃত ‘আদিবাসী’ শব্দ অবশ্যই সংশোধন করে তা মানুষের কাছে পরিষ্কার করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি জটিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হলে পাহাড়ে বর্ষবরণ উৎসবের আমেজে শঙ্কা নেমে আসতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। 

আপনার মতামত লিখুন

প্রতিদিনের বান্দরবান

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬


পার্বত্যমন্ত্রীর পোষ্টে অসাংবিধানিক ‘আদিবাসী’ শব্দ প্রচারণা, পাহাড়ে উৎসবের আমেজে শঙ্কার বার্তা!

প্রকাশের তারিখ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

সম্প্রতি ঢাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উৎসব বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান ও চাংলান উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভা সংক্রান্ত মাননীয় পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এর ফেসবুক পেইজে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’র স্থলে ‘আদিবাসী’ শব্দ লিখা হয়। কিন্তু ‘আদিবাসী’ শব্দটি দেশের সংবিধান পরীপন্থী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতার আলোকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় এ নিয়ে পাহাড়ের মানুষের কাছে উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে মাননীয় মন্ত্রীর পোষ্টে এমন শব্দচয়ন অনিচ্ছাকৃত ভুল কিনা সেটাও ভাবছেন অনেকে। 


দেশের সংবিধান, বিভিন্ন আইন ও দপ্তরে 'উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী' শব্দই স্বীকৃত। তাছাড়া ঐতিহাসিক ভাবে  উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীই তাদের প্রকৃত পরিচয়। তাই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তির বক্তব্যে ব্যবহৃত শব্দচয়ন সংবিধান ও আইনসম্মত হওয়া জরুরি, কারণ এ ধরনের শব্দ রাষ্ট্রীয় নীতির বার্তা বহন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে এমন বিতর্কিত ও অসাংবিধানিক শব্দ রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ফেসবুকে প্রচারণা করা জাতির জন্য শুভ বার্তা বহন করে না। বরং তা বিভাজন ও অনৈক্যের বার্তা দেয়।


বাংলাদেশের সংবিধানে ও রাষ্ট্রীয়ভাবে উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং আদিবাসী শব্দচয়নে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন’। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাধারণ অংশের ১নং ধারা থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে অসংখ্যবার ‘উপজাতি’ উল্লেখ করে তাদের জাতিগত পরিচয় পরিষ্কার করা হয়েছে। তাই অন্য কোনো উড়ে এসে জোড়ে বসা শব্দ কারো পরিচয় বহনের পরিবর্তে পাহাড়ে বিভাজন ও অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত করে।


গত পরশুদিন মাননীয় পার্বত্যমন্ত্রী পাহাড়ী জনগোষ্ঠীকে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ উল্লেখ করে পাহাড়ের মানুষের কাছে ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জন বার্তা প্রদান করলেও আজকে মন্ত্রীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে বিতর্কিত আদিবাসী শব্দ প্রচারণা করাটা হতাশাজনক। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে শব্দচয়নে অসতর্কতা ভুল বোঝাবুঝি বাড়াতে পারে যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে ভূমিকা রাখে; তাই ঐক্য, সংলাপ ও সম্প্রীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তাই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তির শব্দচয়নে সতর্কতা অবলম্বন ও প্রচলিত আইনের দিকে সুদৃষ্টি রাখা অবশ্যই জরুরী।


অন্যদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সামাজিক উৎসব উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা বার্তায় সংবিধান ও আইনসম্মত ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দ এবং সবাই বাংলাদেশী হিসেবে উল্লেখ করে পার্বত্যবাসীকে আশার বার্তা দিয়েছেন। মন্ত্রীর পোষ্টে এমন বিতর্কিত শব্দ উচ্চারণ পাহাড়ের মানুষের মনে ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। তাই পাহাড়ের সকল মানুষের চাওয়া, রাষ্ট্রীয় পদে থাকা যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কথা, ব্ক্তব্য ও কাজে সংবিধানসম্মত, দায়িত্বশীল ও ঐক্যের বার্তা বহন করে এমন শব্দ উচ্চারণ অত্যন্ত জরুরী। অন্যথায় তা বিভাজন ও অনৈক্যের পথ সুগম করে দেয়। 


একজন দায়িত্বশীল ও পাহাড়ের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তির কাছে বিভাজনমূলক ও বিতর্কিত শব্দের পরিবর্তে আইনসম্মত ও দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রত্যাশা করে পাহাড়ের জনগণ। তাই অবিলম্বে পার্বত্য মন্ত্রীর ফেসবুক পোষ্টে উল্লেখিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিবর্তে ব্যবহৃত ‘আদিবাসী’ শব্দ অবশ্যই সংশোধন করে তা মানুষের কাছে পরিষ্কার করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি জটিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হলে পাহাড়ে বর্ষবরণ উৎসবের আমেজে শঙ্কা নেমে আসতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। 


প্রতিদিনের বান্দরবান

সম্পাদক ও প্রকাশকের কার্যালয়ঃ
কপিরাইট © ২০২৬ প্রতিদিনের বান্দরবান । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত