বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলার রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম প্রত্যাহার করে জেলা সদরে স্থানান্তর করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালা ১৯০০-এর ২০ বিধির ক্ষমতাবলে লামা উপজেলার রেজিস্ট্রেশন সম্পর্কিত যাবতীয় কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন শাখা হতে সম্পাদন করা হবে।
গত ২৬ অক্টোবর ২০২৬ (১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) তারিখে বান্দরবান জেলা প্রশাসক নাজমীন সুলতানা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারির একটি পূর্ববর্তী আদেশ বাতিল করা হলো। তবে সরকারি এই সিদ্ধান্তের কারণে লামা উপজেলার সাধারণ মানুষের ভূমি সংক্রান্ত সেবাপ্রাপ্তিতে তীব্র ভোগান্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দূরবর্তী উপজেলা লামা থেকে রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম হঠাৎ জেলা সদরে নিয়ে যাওয়ায় চরম দুশ্চিন্তা ও ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, যেখানে সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা, সেখানে চলমান একটি সেবা ব্যবস্থা ভেঙে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি দূরত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সামান্য ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নকল তোলা বা এ সংক্রান্ত কাজের জন্য এখন থেকে তাঁদের দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে বান্দরবান জেলা সদরে যেতে হবে। এতে সময় ও যাতায়াত খরচ যেমন কয়েক গুণ বাড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষকে চরম হয়রানি ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে।
ভূমি রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম প্রত্যাহারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর লামার স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ সেবা প্রার্থীরা চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ কৃষক আহমদ উল্লাহ ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, "এই বয়সে ভাঙা শরীর নিয়ে লামা থেকে বান্দরবান সদরে গিয়ে জমির কাজ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। একটা সইয়ের জন্য বা কাগজের খোঁজে অত দূরে যাওয়া মানে পুরো একদিন নষ্ট আর শরীরের ওপর চরম অত্যাচার। আমাদের মতো গরিব মানুষের পেটে লাথি মারা হলো। ঘরের কাছের সেবা কেন এভাবে কেড়ে নেওয়া হলো?"
জমি সংক্রান্ত কাজে আসা গৃহিণী রাশেদা বেগম (৪৫) তাঁর অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, "আমার স্বামীর রেখে যাওয়া সামান্য জমিটুকু সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার কথা ছিল। এখন শুনছি বান্দরবান সদরে যেতে হবে। রাস্তাঘাটের যে অবস্থা, একা একজন নারী হিসেবে অত দূরে গিয়ে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে কাজ করা কতটা কষ্টের, তা কেবল আমরাই বুঝি। আমাদের ভোগান্তি দেখার কি কেউ নেই?"
স্থানীয় তরুণ সমাজ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মো. কামাল হোসেন নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, "সেবা সহজ করার যুগে লামার ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটল। জেলা সদরে গিয়ে কাজ করতে গেলে যাতায়াত, থাকা-খাওয়া বাবদ সাধারণ মানুষের কয়েক গুণ বেশি টাকা খরচ হবে। এই আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি কে পূরণ করবে?"
জরুরি এই সেবাটি স্থানীয় পর্যায় থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ায় লামা উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে দালালি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আরও বৃদ্ধি পাবে। তারা অতি দ্রুত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে স্থানীয়ভাবে লামা উপজেলাতেই ভূমি রেজিস্ট্রেশন সেবা বহাল রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক নির্দেশনার আলোকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে জনগণের সার্বিক ভোগান্তি ও স্থানীয় দাবির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিবেচনা করার অনুরোধ জানানো হতে পারে।

বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬
বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলার রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম প্রত্যাহার করে জেলা সদরে স্থানান্তর করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালা ১৯০০-এর ২০ বিধির ক্ষমতাবলে লামা উপজেলার রেজিস্ট্রেশন সম্পর্কিত যাবতীয় কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন শাখা হতে সম্পাদন করা হবে।
গত ২৬ অক্টোবর ২০২৬ (১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) তারিখে বান্দরবান জেলা প্রশাসক নাজমীন সুলতানা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারির একটি পূর্ববর্তী আদেশ বাতিল করা হলো। তবে সরকারি এই সিদ্ধান্তের কারণে লামা উপজেলার সাধারণ মানুষের ভূমি সংক্রান্ত সেবাপ্রাপ্তিতে তীব্র ভোগান্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দূরবর্তী উপজেলা লামা থেকে রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম হঠাৎ জেলা সদরে নিয়ে যাওয়ায় চরম দুশ্চিন্তা ও ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, যেখানে সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা, সেখানে চলমান একটি সেবা ব্যবস্থা ভেঙে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি দূরত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সামান্য ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নকল তোলা বা এ সংক্রান্ত কাজের জন্য এখন থেকে তাঁদের দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে বান্দরবান জেলা সদরে যেতে হবে। এতে সময় ও যাতায়াত খরচ যেমন কয়েক গুণ বাড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষকে চরম হয়রানি ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে।
ভূমি রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম প্রত্যাহারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর লামার স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ সেবা প্রার্থীরা চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ কৃষক আহমদ উল্লাহ ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, "এই বয়সে ভাঙা শরীর নিয়ে লামা থেকে বান্দরবান সদরে গিয়ে জমির কাজ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। একটা সইয়ের জন্য বা কাগজের খোঁজে অত দূরে যাওয়া মানে পুরো একদিন নষ্ট আর শরীরের ওপর চরম অত্যাচার। আমাদের মতো গরিব মানুষের পেটে লাথি মারা হলো। ঘরের কাছের সেবা কেন এভাবে কেড়ে নেওয়া হলো?"
জমি সংক্রান্ত কাজে আসা গৃহিণী রাশেদা বেগম (৪৫) তাঁর অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, "আমার স্বামীর রেখে যাওয়া সামান্য জমিটুকু সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার কথা ছিল। এখন শুনছি বান্দরবান সদরে যেতে হবে। রাস্তাঘাটের যে অবস্থা, একা একজন নারী হিসেবে অত দূরে গিয়ে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে কাজ করা কতটা কষ্টের, তা কেবল আমরাই বুঝি। আমাদের ভোগান্তি দেখার কি কেউ নেই?"
স্থানীয় তরুণ সমাজ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মো. কামাল হোসেন নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, "সেবা সহজ করার যুগে লামার ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটল। জেলা সদরে গিয়ে কাজ করতে গেলে যাতায়াত, থাকা-খাওয়া বাবদ সাধারণ মানুষের কয়েক গুণ বেশি টাকা খরচ হবে। এই আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি কে পূরণ করবে?"
জরুরি এই সেবাটি স্থানীয় পর্যায় থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ায় লামা উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে দালালি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আরও বৃদ্ধি পাবে। তারা অতি দ্রুত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে স্থানীয়ভাবে লামা উপজেলাতেই ভূমি রেজিস্ট্রেশন সেবা বহাল রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক নির্দেশনার আলোকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে জনগণের সার্বিক ভোগান্তি ও স্থানীয় দাবির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিবেচনা করার অনুরোধ জানানো হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন