আদালত যাকে ‘ভুয়া ও জাল’ সাব্যস্ত করে আসামিদের জেলহাজতে পাঠালেন, তার ঠিক আট দিনের মাথায় সেই অস্তিত্বহীন দলিলের ‘অবিকল নকল’ (সার্টিফাইড কপি) সরবরাহ করে নজিরবিহীন এক কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছেন বান্দরবানের লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা রেজিস্ট্রেশন অফিসার মোঃ মাইন উদ্দিন! একটি বিচারাধীন জালিয়াতি মামলার প্রধান আলামতকে খোদ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা কর্তৃক এভাবে ‘বৈধ’ করার অপচেষ্টায় স্থানীয় আইনি ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ফেঁসে যাওয়া আসামিদের বাঁচাতে এই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন খোদ ইউএনও।
অনুসন্ধানে জানা যায়, লামার ছাগলখাইয়া মৌজার ২৩৯নং হোল্ডিংয়ের জমি নিয়ে স্থানীয় শাহিনুর বেগম বাদী হয়ে আদালতে একটি সিআর মামলা (নং-১৭৫/২৩) দায়ের করেন। মামলার প্রধান বিবাদী এস এম আবু তাহের গং জমিটি নিজেদের দাবি করতে ৬৪৮/১৯৯৮ ইং তারিখের একটি বায়নানামা দলিল উপস্থাপন করেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ৯ মার্চ তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ উল্লাহ নিজামীর শুনানিতেই বালাম বই তলব করে দেখা যায়, এই দলিলের কোনো অস্তিত্বই নেই।
পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে তদন্তে নামে লামা থানা পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে লামা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে আবেদন করা হলে, গত বছরের ২৮ আগস্ট বর্তমান ইউএনও ও রেজিস্ট্রেশন অফিসার মোঃ মাইন উদ্দিন নিজেই দাপ্তরিক চিঠিতে (স্মারক নং- ০৫.৪২.০৩৫১.২০৪.১২.০২৮.২৫-১১২৩) পুলিশকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ৬৪৮/১৯৯৮ নং দলিলটি বালাম বহিতে সংরক্ষিত না থাকায় এর নকল সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
রেকর্ড রুমে দলিলের কোনো অস্তিত্ব না থাকায় এবং জালিয়াতি চূড়ান্ত প্রমাণিত হওয়ায় গত ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। এর প্রেক্ষিতে গত ২৪ মে ২০২৬ তারিখে বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দলিলটিকে জাল সাব্যস্ত করে শিলেরতুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রাজিয়া বেগম ও দলিল লেখক মিলন কান্তি চৌধুরীসহ চার আসামিকে সরাসরি জেলহাজতে প্রেরণ করেন।
কিন্তু এর ঠিক আট দিন পর, গত ২ জুন ২০২৬ তারিখে ঘটে প্রশাসনের ইতিহাসের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও রহস্যজনক ঘটনা! যে কর্মকর্তা এক বছর আগে পুলিশকে লিখিত দিলেন "দলিল বালামে নাই", এবং যে দলিলের কারণে আসামিরা জেলে খাটছেন; কোনো আইনগত বালাম পুনর্গঠন (Reconstruction) ছাড়াই হঠাৎ করে আসামিরা জেলে যাওয়ার পর জুন মাসের ২ তারিখে স্বয়ং ইউএনও মোঃ মাইন উদ্দিন ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ৭৬ ধারা ব্যবহার করে সেই ভুয়া দলিলের ‘অবিকল নকল’ নিজের সিল ও স্বাক্ষরে প্রত্যয়ন করে ইস্যু করেন!
আইনজীবীদের মতে, ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ৭৬ ধারা অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মকর্তা কেবল তখনই কোনো দলিলের সার্টিফাইড কপি দিতে পারেন, যখন সেই মূল নথিটি আইনগতভাবে তাঁর হেফাজতে বা বালাম বহিতে সংরক্ষিত থাকে। বালামে নথি না থাকা সত্ত্বেও এবং আদালত কর্তৃক সেটি ভুয়া ঘোষণার পর সেটির নকল সরবরাহ করা সরাসরি আদালতের আদেশের অবমাননা এবং ফৌজদারি অপরাধ।
এ বিষয়ে জানতে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মাইন উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ফেঁসে যাওয়া সরকারি চাকরি ও আসামিদের আইনি সুবিধা দিতেই তড়িঘড়ি করে বালাম বইয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই নজিরবিহীন জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জেলা প্রশাসকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদালত যাকে ‘ভুয়া ও জাল’ সাব্যস্ত করে আসামিদের জেলহাজতে পাঠালেন, তার ঠিক আট দিনের মাথায় সেই অস্তিত্বহীন দলিলের ‘অবিকল নকল’ (সার্টিফাইড কপি) সরবরাহ করে নজিরবিহীন এক কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছেন বান্দরবানের লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা রেজিস্ট্রেশন অফিসার মোঃ মাইন উদ্দিন! একটি বিচারাধীন জালিয়াতি মামলার প্রধান আলামতকে খোদ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা কর্তৃক এভাবে ‘বৈধ’ করার অপচেষ্টায় স্থানীয় আইনি ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ফেঁসে যাওয়া আসামিদের বাঁচাতে এই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন খোদ ইউএনও।
অনুসন্ধানে জানা যায়, লামার ছাগলখাইয়া মৌজার ২৩৯নং হোল্ডিংয়ের জমি নিয়ে স্থানীয় শাহিনুর বেগম বাদী হয়ে আদালতে একটি সিআর মামলা (নং-১৭৫/২৩) দায়ের করেন। মামলার প্রধান বিবাদী এস এম আবু তাহের গং জমিটি নিজেদের দাবি করতে ৬৪৮/১৯৯৮ ইং তারিখের একটি বায়নানামা দলিল উপস্থাপন করেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ৯ মার্চ তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ উল্লাহ নিজামীর শুনানিতেই বালাম বই তলব করে দেখা যায়, এই দলিলের কোনো অস্তিত্বই নেই।
পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে তদন্তে নামে লামা থানা পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে লামা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে আবেদন করা হলে, গত বছরের ২৮ আগস্ট বর্তমান ইউএনও ও রেজিস্ট্রেশন অফিসার মোঃ মাইন উদ্দিন নিজেই দাপ্তরিক চিঠিতে (স্মারক নং- ০৫.৪২.০৩৫১.২০৪.১২.০২৮.২৫-১১২৩) পুলিশকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ৬৪৮/১৯৯৮ নং দলিলটি বালাম বহিতে সংরক্ষিত না থাকায় এর নকল সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
রেকর্ড রুমে দলিলের কোনো অস্তিত্ব না থাকায় এবং জালিয়াতি চূড়ান্ত প্রমাণিত হওয়ায় গত ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। এর প্রেক্ষিতে গত ২৪ মে ২০২৬ তারিখে বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দলিলটিকে জাল সাব্যস্ত করে শিলেরতুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রাজিয়া বেগম ও দলিল লেখক মিলন কান্তি চৌধুরীসহ চার আসামিকে সরাসরি জেলহাজতে প্রেরণ করেন।
কিন্তু এর ঠিক আট দিন পর, গত ২ জুন ২০২৬ তারিখে ঘটে প্রশাসনের ইতিহাসের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও রহস্যজনক ঘটনা! যে কর্মকর্তা এক বছর আগে পুলিশকে লিখিত দিলেন "দলিল বালামে নাই", এবং যে দলিলের কারণে আসামিরা জেলে খাটছেন; কোনো আইনগত বালাম পুনর্গঠন (Reconstruction) ছাড়াই হঠাৎ করে আসামিরা জেলে যাওয়ার পর জুন মাসের ২ তারিখে স্বয়ং ইউএনও মোঃ মাইন উদ্দিন ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ৭৬ ধারা ব্যবহার করে সেই ভুয়া দলিলের ‘অবিকল নকল’ নিজের সিল ও স্বাক্ষরে প্রত্যয়ন করে ইস্যু করেন!
আইনজীবীদের মতে, ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ৭৬ ধারা অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মকর্তা কেবল তখনই কোনো দলিলের সার্টিফাইড কপি দিতে পারেন, যখন সেই মূল নথিটি আইনগতভাবে তাঁর হেফাজতে বা বালাম বহিতে সংরক্ষিত থাকে। বালামে নথি না থাকা সত্ত্বেও এবং আদালত কর্তৃক সেটি ভুয়া ঘোষণার পর সেটির নকল সরবরাহ করা সরাসরি আদালতের আদেশের অবমাননা এবং ফৌজদারি অপরাধ।
এ বিষয়ে জানতে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মাইন উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ফেঁসে যাওয়া সরকারি চাকরি ও আসামিদের আইনি সুবিধা দিতেই তড়িঘড়ি করে বালাম বইয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই নজিরবিহীন জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জেলা প্রশাসকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।

আপনার মতামত লিখুন