প্রতিদিনের বান্দরবান

অবশেষে পাপের ঘড়া পূর্ণ: জালিয়াতির ঢাল হওয়া সেই বিতর্কিত ইউএনও মাইন উদ্দিনের তড়িঘড়ি বদলি!



অবশেষে পাপের ঘড়া পূর্ণ: জালিয়াতির ঢাল হওয়া সেই বিতর্কিত ইউএনও মাইন উদ্দিনের তড়িঘড়ি বদলি!
ছবি: সংগৃহীত

বদলিই কি শেষ রক্ষা? জালিয়াতি ঢাকতে ৫ লাখের চুক্তির গুঞ্জনের মধ্যেই লামা থেকে আশুগঞ্জে পদায়ন বিতর্কিত ইউএনও মাইন উদ্দিনের!

আদালতে জাল প্রমাণিত দলিলের ভূতুড়ে ‘অবিকল নকল’ প্রত্যয়ন করে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করা কর্মকর্তা মাইন উদ্দিনের বদলির সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নাকি নিরাপদ প্রস্থান? প্রশ্ন সচেতন মহলে।

বান্দরবানের লামা উপজেলায় দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক দলিল জালিয়াতির আসামিদের বাঁচাতে নগ্নভাবে মাঠে নামা সেই বিতর্কিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও রেজিস্ট্রেশন অফিসার মোঃ মাইন উদ্দিনকে অবশেষে লামা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে জারি করা এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে (নম্বর: ০৫.৪২.২০০০.০০০.১৮.১৯.০০০১.২৬.৯২১) তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার ইউএনও হিসেবে বদলি ও পদায়ন করা হয়।

তবে এই বদলির আদেশের সমান্তরালেই কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসছে। আদালতের রায়ে ‘জাল’ সাব্যস্ত হওয়া দলিলকে রাতারাতি সরকারি সিল-স্বাক্ষরে ‘অবিকল নকল’ প্রত্যয়ন করে দেওয়ার অবিশ্বাস্য জাদুর নেপথ্যে এবার ৫ লক্ষ টাকার এক বিশাল গোপন চুক্তির খবর ফাঁস হয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, জালিয়াতির দায়ে কারাগারে থাকা আসামিদের বাঁচাতে এবং ভিউয়া দলিলটিকে যেকোনো মূল্যে বৈধ্যতা দিতে এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছিল।

৫ লাখে ‘সবই সম্ভব’: এক বছর আগের ‘নাই’ রাতারাতি বালামে! দালিলিক প্রমাণ বলছে, গত বছরের ২৮ আগস্ট এই ইউএনও মাইন উদ্দিন নিজেই লিখিতভাবে (স্মারক নং- ০৫.৪২.০৩৫১.২০৪.১২.০২৮.২৫-১১২৩) পুলিশকে জানিয়েছিলেন যে, বিতর্কিত ৬৪৮/১৯৯৮ নং দলিলটি বালাম বহিতে সংরক্ষিত নেই। রেকর্ড রুমে দলিলের অস্তিত্ব না থাকায় পুলিশ চার্জশিট দেয় এবং গত ২৪ মে ২০২৬ তারিখে বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দলিলটিকে ‘জাল’ সাব্যস্ত করে প্রধান শিক্ষিকা রাজিয়া বেগম ও দলিল লেখক মিলন কান্তি চৌধুরীসহ চার আসামিকে সরাসরি জেলহাজতে পাঠান।

কিন্তু আসামিরা জেলে যাওয়ার ঠিক আট দিন পর, অর্থাৎ গত ২ জুন ২০২৬ তারিখে রহস্যজনকভাবে ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ৭৬ ধারা ব্যবহার করে সেই ভিউয়া দলিলের ‘অবিকল নকল’ নিজের সিল ও স্বাক্ষরে প্রত্যয়ন করে আসামিদের হাতে তুলে দেন খোদ ইউএনও। স্থানীয়দের তীব্র অভিযোগ, এই অবিশ্বাস্য ‘ভোজবাজি’র পেছনে কাজ করেছে সেই ৫ লক্ষ টাকার গোপন রফা। টাকার জোরেই কোনো আইনি বালাম পুনর্গঠন ছাড়াই মাঝরাতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নথিতে নতুন ভূতুড়ে পাতা জোড়া দেওয়া হয়েছিল।

বদলিই কি শেষ, নাকি দুদকের খাঁচায় পুরে দেওয়া হবে এই সিন্ডিকেটকে? তীব্র তোলপাড় ও গণমাধ্যমের চাপের মুখে মাইন উদ্দিনকে আশুগঞ্জে তড়িঘড়ি বদলি করা হলেও, এই শাস্তিকে স্রেফ ‘আইওয়াশ’ ও নিরাপদ প্রস্থান বলে মনে করছে স্থানীয় সচেতন মহল। ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে আদালতের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো, পুলিশের তদন্ত নস্যাৎ করা এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের পর শুধু ‘বদলি’ কোনো সাজা হতে পারে না।

আইন বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট অভিমত, এই চুক্তি ও জালিয়াতির ঘটনা সরাসরি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এখতিয়ারভুক্ত। অবিলম্বে বিদায়ী ইউএনও মাইন উদ্দিন, কারাবন্দী প্রধান শিক্ষিকা রাজিয়া বেগম ও জালিয়াতি সিন্ডিকেটের সদস্যদের বিরুদ্ধে আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে দুদক ও বিচার বিভাগীয় সুনির্দিষ্ট তদন্তের দাবি উঠেছে। ৫ লক্ষ টাকার এই কালো বিড়ালের থাবা কার কার পকেটে গেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচন করে এদের সবাইকে জেলের ভাত খাওয়ানোই এখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ।

আপনার মতামত লিখুন

প্রতিদিনের বান্দরবান

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬


অবশেষে পাপের ঘড়া পূর্ণ: জালিয়াতির ঢাল হওয়া সেই বিতর্কিত ইউএনও মাইন উদ্দিনের তড়িঘড়ি বদলি!

প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বদলিই কি শেষ রক্ষা? জালিয়াতি ঢাকতে ৫ লাখের চুক্তির গুঞ্জনের মধ্যেই লামা থেকে আশুগঞ্জে পদায়ন বিতর্কিত ইউএনও মাইন উদ্দিনের!

আদালতে জাল প্রমাণিত দলিলের ভূতুড়ে ‘অবিকল নকল’ প্রত্যয়ন করে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করা কর্মকর্তা মাইন উদ্দিনের বদলির সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নাকি নিরাপদ প্রস্থান? প্রশ্ন সচেতন মহলে।

বান্দরবানের লামা উপজেলায় দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক দলিল জালিয়াতির আসামিদের বাঁচাতে নগ্নভাবে মাঠে নামা সেই বিতর্কিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও রেজিস্ট্রেশন অফিসার মোঃ মাইন উদ্দিনকে অবশেষে লামা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে জারি করা এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে (নম্বর: ০৫.৪২.২০০০.০০০.১৮.১৯.০০০১.২৬.৯২১) তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার ইউএনও হিসেবে বদলি ও পদায়ন করা হয়।

তবে এই বদলির আদেশের সমান্তরালেই কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসছে। আদালতের রায়ে ‘জাল’ সাব্যস্ত হওয়া দলিলকে রাতারাতি সরকারি সিল-স্বাক্ষরে ‘অবিকল নকল’ প্রত্যয়ন করে দেওয়ার অবিশ্বাস্য জাদুর নেপথ্যে এবার ৫ লক্ষ টাকার এক বিশাল গোপন চুক্তির খবর ফাঁস হয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, জালিয়াতির দায়ে কারাগারে থাকা আসামিদের বাঁচাতে এবং ভিউয়া দলিলটিকে যেকোনো মূল্যে বৈধ্যতা দিতে এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছিল।

৫ লাখে ‘সবই সম্ভব’: এক বছর আগের ‘নাই’ রাতারাতি বালামে! দালিলিক প্রমাণ বলছে, গত বছরের ২৮ আগস্ট এই ইউএনও মাইন উদ্দিন নিজেই লিখিতভাবে (স্মারক নং- ০৫.৪২.০৩৫১.২০৪.১২.০২৮.২৫-১১২৩) পুলিশকে জানিয়েছিলেন যে, বিতর্কিত ৬৪৮/১৯৯৮ নং দলিলটি বালাম বহিতে সংরক্ষিত নেই। রেকর্ড রুমে দলিলের অস্তিত্ব না থাকায় পুলিশ চার্জশিট দেয় এবং গত ২৪ মে ২০২৬ তারিখে বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দলিলটিকে ‘জাল’ সাব্যস্ত করে প্রধান শিক্ষিকা রাজিয়া বেগম ও দলিল লেখক মিলন কান্তি চৌধুরীসহ চার আসামিকে সরাসরি জেলহাজতে পাঠান।

কিন্তু আসামিরা জেলে যাওয়ার ঠিক আট দিন পর, অর্থাৎ গত ২ জুন ২০২৬ তারিখে রহস্যজনকভাবে ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ৭৬ ধারা ব্যবহার করে সেই ভিউয়া দলিলের ‘অবিকল নকল’ নিজের সিল ও স্বাক্ষরে প্রত্যয়ন করে আসামিদের হাতে তুলে দেন খোদ ইউএনও। স্থানীয়দের তীব্র অভিযোগ, এই অবিশ্বাস্য ‘ভোজবাজি’র পেছনে কাজ করেছে সেই ৫ লক্ষ টাকার গোপন রফা। টাকার জোরেই কোনো আইনি বালাম পুনর্গঠন ছাড়াই মাঝরাতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নথিতে নতুন ভূতুড়ে পাতা জোড়া দেওয়া হয়েছিল।

বদলিই কি শেষ, নাকি দুদকের খাঁচায় পুরে দেওয়া হবে এই সিন্ডিকেটকে? তীব্র তোলপাড় ও গণমাধ্যমের চাপের মুখে মাইন উদ্দিনকে আশুগঞ্জে তড়িঘড়ি বদলি করা হলেও, এই শাস্তিকে স্রেফ ‘আইওয়াশ’ ও নিরাপদ প্রস্থান বলে মনে করছে স্থানীয় সচেতন মহল। ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে আদালতের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো, পুলিশের তদন্ত নস্যাৎ করা এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের পর শুধু ‘বদলি’ কোনো সাজা হতে পারে না।

আইন বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট অভিমত, এই চুক্তি ও জালিয়াতির ঘটনা সরাসরি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এখতিয়ারভুক্ত। অবিলম্বে বিদায়ী ইউএনও মাইন উদ্দিন, কারাবন্দী প্রধান শিক্ষিকা রাজিয়া বেগম ও জালিয়াতি সিন্ডিকেটের সদস্যদের বিরুদ্ধে আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে দুদক ও বিচার বিভাগীয় সুনির্দিষ্ট তদন্তের দাবি উঠেছে। ৫ লক্ষ টাকার এই কালো বিড়ালের থাবা কার কার পকেটে গেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচন করে এদের সবাইকে জেলের ভাত খাওয়ানোই এখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ।


প্রতিদিনের বান্দরবান

সম্পাদক ও প্রকাশকের কার্যালয়ঃ
কপিরাইট © ২০২৬ প্রতিদিনের বান্দরবান । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত