পার্বত্য জেলা বান্দরবানে বন বিভাগের লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই বেপরোয়াভাবে চলছে একের পর এক করাতকল (সমিল)। জেলার সাতটি উপজেলায় সচল ৮১টি করাতকলের মধ্যে ৩৬টিই চলছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। এছাড়া পরিবেশগত ছাড়পত্র থাকলেও ১০টি প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র নবায়ন করা হয়নি। খোদ জেলা শহর ও উপজেলাগুলোর আবাসিক এলাকা, সরকারি স্থাপনা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়াল ঘেঁষে এসব মিল চলায় তীব্র শব্দদূষণ ও বর্জ্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘করাতকল স্থাপন ও পরিচালনা বিধিমালা, ২০১২’ অনুযায়ী সরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ জনস্বাস্থ্য বা পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা থেকে অন্তত ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রেখে করাতকল স্থাপনের স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বান্দরবানে এই নিয়মের কোনো তোয়াক্কাই করা হচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বান্দরবান পৌরসভার বালাঘাটা এলাকায় মূল সড়কের দুই পাশে অন্তত সাতটি করাতকল দীর্ঘদিন ধরে চলছে। উজানীপাড়া এলাকায় রয়েছে দুটি এবং বনানী সমিল এলাকায় রয়েছে একটি। এর মধ্যে উজানীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষেই চলছে একটি করাতকল। স্থানীয় বাসিন্দা মংহ্লাচিং মারমা ও শৈমং মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "দিন-রাত করাতকলের তীব্র শব্দে কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। শিশুদের যাতায়াতের রাস্তা দিয়েই প্রতিনিয়ত বড় বড় কাঠের ট্রাক চলাচল করায় সবসময় দুর্ঘটনার আতঙ্ক থাকে।" আরেক বাসিন্দা ক্যসাইনুং মারমা জানান, আবাসিক এলাকার ভেতরে দিন-রাত কাঠের মিল চলায় স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাছাকাছি এসব করাতকল স্থাপন করায় বনের সরকারি গাছ অবৈধভাবে কেটে সাবাড় করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এসব করাতকলের পেছনে সাবেক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক ছত্রছায়াই মূল কারণ বলে জানা গেছে। তবে এই বিষয়ে করাতকলের মালিকরা গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। করাতকল মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ রফিক দাবি করেন, তারা বন বিভাগের লাইসেন্স নবায়ন করলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এখনো নেননি।
বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বান্দরবানে বন ও পাল্পউড প্ল্যান্টেশন বিভাগের অধীনে রয়েছে ২১টি করাতকল। অন্যদিকে লামা বন বিভাগের আওতায় রয়েছে ৬০টি করাতকল (লামায় ২১টি, আলীকদমে ৯টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৩০টি)। সর্বমোট ৮১টি করাতকলের মধ্যে ৪৫টির লাইসেন্স থাকলেও বাকি ৩৬টি সম্পূর্ণ অবৈধ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নুর হাসান সজীব জানান, জেলায় ৪৫টি করাতকলের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে, যার মধ্যে ৩৫টি নবায়ন করা হলেও ১০টি নবায়নহীন। তিনি বলেন, "জেলায় যতগুলো অবৈধ করাতকল রয়েছে, সবগুলোকে দ্রুত নোটিশ দেওয়া হবে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
লামা বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুস্তাফাফিজুর রহমান বলেন, "বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ির অনেক করাতকল মালিক লাইসেন্স নেননি। খুব শিগগিরই যারা লাইসেন্স বা পরিবেশগত ছাড়পত্র নবায়ন করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালানো হবে।"
স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, জনস্বাস্থ্য ও পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষায় শুধু নোটিশ নয়, অবিলম্বে এসব অবৈধ করাতকল বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কঠোর অভিযান চালানো প্রয়োজন।

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬
পার্বত্য জেলা বান্দরবানে বন বিভাগের লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই বেপরোয়াভাবে চলছে একের পর এক করাতকল (সমিল)। জেলার সাতটি উপজেলায় সচল ৮১টি করাতকলের মধ্যে ৩৬টিই চলছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। এছাড়া পরিবেশগত ছাড়পত্র থাকলেও ১০টি প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র নবায়ন করা হয়নি। খোদ জেলা শহর ও উপজেলাগুলোর আবাসিক এলাকা, সরকারি স্থাপনা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়াল ঘেঁষে এসব মিল চলায় তীব্র শব্দদূষণ ও বর্জ্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘করাতকল স্থাপন ও পরিচালনা বিধিমালা, ২০১২’ অনুযায়ী সরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ জনস্বাস্থ্য বা পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা থেকে অন্তত ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রেখে করাতকল স্থাপনের স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বান্দরবানে এই নিয়মের কোনো তোয়াক্কাই করা হচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বান্দরবান পৌরসভার বালাঘাটা এলাকায় মূল সড়কের দুই পাশে অন্তত সাতটি করাতকল দীর্ঘদিন ধরে চলছে। উজানীপাড়া এলাকায় রয়েছে দুটি এবং বনানী সমিল এলাকায় রয়েছে একটি। এর মধ্যে উজানীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষেই চলছে একটি করাতকল। স্থানীয় বাসিন্দা মংহ্লাচিং মারমা ও শৈমং মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "দিন-রাত করাতকলের তীব্র শব্দে কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। শিশুদের যাতায়াতের রাস্তা দিয়েই প্রতিনিয়ত বড় বড় কাঠের ট্রাক চলাচল করায় সবসময় দুর্ঘটনার আতঙ্ক থাকে।" আরেক বাসিন্দা ক্যসাইনুং মারমা জানান, আবাসিক এলাকার ভেতরে দিন-রাত কাঠের মিল চলায় স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাছাকাছি এসব করাতকল স্থাপন করায় বনের সরকারি গাছ অবৈধভাবে কেটে সাবাড় করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এসব করাতকলের পেছনে সাবেক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক ছত্রছায়াই মূল কারণ বলে জানা গেছে। তবে এই বিষয়ে করাতকলের মালিকরা গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। করাতকল মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ রফিক দাবি করেন, তারা বন বিভাগের লাইসেন্স নবায়ন করলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এখনো নেননি।
বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বান্দরবানে বন ও পাল্পউড প্ল্যান্টেশন বিভাগের অধীনে রয়েছে ২১টি করাতকল। অন্যদিকে লামা বন বিভাগের আওতায় রয়েছে ৬০টি করাতকল (লামায় ২১টি, আলীকদমে ৯টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৩০টি)। সর্বমোট ৮১টি করাতকলের মধ্যে ৪৫টির লাইসেন্স থাকলেও বাকি ৩৬টি সম্পূর্ণ অবৈধ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নুর হাসান সজীব জানান, জেলায় ৪৫টি করাতকলের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে, যার মধ্যে ৩৫টি নবায়ন করা হলেও ১০টি নবায়নহীন। তিনি বলেন, "জেলায় যতগুলো অবৈধ করাতকল রয়েছে, সবগুলোকে দ্রুত নোটিশ দেওয়া হবে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
লামা বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুস্তাফাফিজুর রহমান বলেন, "বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ির অনেক করাতকল মালিক লাইসেন্স নেননি। খুব শিগগিরই যারা লাইসেন্স বা পরিবেশগত ছাড়পত্র নবায়ন করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালানো হবে।"
স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, জনস্বাস্থ্য ও পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষায় শুধু নোটিশ নয়, অবিলম্বে এসব অবৈধ করাতকল বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কঠোর অভিযান চালানো প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন