প্রতিদিনের বান্দরবান

‘নিলাম’ বাণিজ্যে ফাঁসিয়াখালী-সরই গিলে খাচ্ছে বালুখেকো সিন্ডিকেট!



‘নিলাম’ বাণিজ্যে ফাঁসিয়াখালী-সরই গিলে খাচ্ছে বালুখেকো সিন্ডিকেট!
ছবি: প্রতিদিনের বান্দরবান

সেলোমেশিনের গর্জনে কাঁপছে ফাঁসিয়াখালী: হুমকিতে সেতু-কালভার্ট, গিলে খাচ্ছে কৃষিজমি ও ঘরবাড়ি

কাগজে-কলমে প্রশাসন বালু জব্দ করে নিলাম দিচ্ছে, আর সেই নিলামের কাগজকে ‘লাইসেন্স’ বানিয়ে নদী আর ছড়া গিলে খাচ্ছে একদল বালুখেকো। বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে এখন চলছে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার বালু লুটের মহোৎসব। শতাধিক পয়েন্টে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সেলোমেশিন বসিয়ে বুক চিরে তোলা হচ্ছে বালু। ফলশ্রুতিতে ধসে পড়ছে কোটি টাকার সরকারি সেতু, নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে কৃষকের শেষ সম্বল ফসলি জমি আর বসতভিটা। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব, বিপরীতে পকেট ভারী হচ্ছে স্থানীয় বালু সিন্ডিকেটের।

স্থানীয়দের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রশাসন যখনই কোনো অবৈধ বালুর স্তূপ জব্দ করে নিলামে বিক্রি করছে, তখনই কপাল খুলছে বালুখেকোদের। নিলামে কেনা বালুর সেই স্তূপকে ঢাল বানিয়ে, একই কাগজ দেখিয়ে নদী থেকে প্রতিদিন দ্বিগুণ পরিমাণ নতুন বালু তোলা হচ্ছে। প্রশাসনের চোখের সামনেই এই ওপেন সিক্রেট জালিয়াতি চললেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগের তীর স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দিকে। স্থানীয়দের দাবি ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নেই শতাধিক অবৈধ বালুর পয়েন্ট চালু রয়েছে। তারমধ্যে আবুল হোসেন নামের এক ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রণেই চলছে অন্তত ৯টি বালুর পয়েন্ট। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী সরই ইউনিয়ন এখন অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের মূল অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সরইয়ের ডজন ডজন স্পটে প্রকাশ্যেই চলছে এই লুটপাট। বিশেষ করে সরই খাল, পুলু খাল, আন্ধারী খাল এবং হরি খালে ড্রেজার বসিয়ে নির্বিচারে বালি তোলা হচ্ছে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়ায় এই সিন্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া যে, দিনের আলো ফুরিয়ে রাতের আঁধার নামলেও থামে না ডাম্প ট্রাকের গর্জন। রাতভর শত শত ট্রাক বালু পরিবহনের কারণে গ্রামীণ সড়কগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে, আর নির্ঘুম রাত কাটছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্বিচারে বালু তোলার কারণে নদী ও ছড়ার তলদেশ অস্বাভাবিক নেমে গেছে। এতে সেতুর পিলার ও কালভার্টের নিচের মাটি সরে গিয়ে সেগুলো এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে সরকারের মেগা বাজেটের এই যোগাযোগ ব্যবস্থা। এছাড়া তীব্র ভাঙনে নদীপাড়ের কাঁচা-পাকা ঘরবাড়িগুলো ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। বিস্তীর্ণ ফসলি জমি হারিয়ে অনেক কৃষক এখন নিঃস্ব।

স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের চোখের সামনে ঘরবাড়ি আর রাস্তাঘাট শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকি দেওয়া হয়। নিলামের নামে মূলত অবৈধ বালু চুরির স্থায়ী লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।"

প্রশাসনের এই 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি' স্বভাবের কারণে ফাঁসিয়াখালীর পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের জীবন আজ বিপন্ন। অবিলম্বে টাস্কফোর্সের চিরুনি অভিযান এবং এই রাক্ষুসে বালু সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় না আনলে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা।

আপনার মতামত লিখুন

প্রতিদিনের বান্দরবান

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬


‘নিলাম’ বাণিজ্যে ফাঁসিয়াখালী-সরই গিলে খাচ্ছে বালুখেকো সিন্ডিকেট!

প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সেলোমেশিনের গর্জনে কাঁপছে ফাঁসিয়াখালী: হুমকিতে সেতু-কালভার্ট, গিলে খাচ্ছে কৃষিজমি ও ঘরবাড়ি

কাগজে-কলমে প্রশাসন বালু জব্দ করে নিলাম দিচ্ছে, আর সেই নিলামের কাগজকে ‘লাইসেন্স’ বানিয়ে নদী আর ছড়া গিলে খাচ্ছে একদল বালুখেকো। বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে এখন চলছে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার বালু লুটের মহোৎসব। শতাধিক পয়েন্টে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সেলোমেশিন বসিয়ে বুক চিরে তোলা হচ্ছে বালু। ফলশ্রুতিতে ধসে পড়ছে কোটি টাকার সরকারি সেতু, নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে কৃষকের শেষ সম্বল ফসলি জমি আর বসতভিটা। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব, বিপরীতে পকেট ভারী হচ্ছে স্থানীয় বালু সিন্ডিকেটের।


স্থানীয়দের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রশাসন যখনই কোনো অবৈধ বালুর স্তূপ জব্দ করে নিলামে বিক্রি করছে, তখনই কপাল খুলছে বালুখেকোদের। নিলামে কেনা বালুর সেই স্তূপকে ঢাল বানিয়ে, একই কাগজ দেখিয়ে নদী থেকে প্রতিদিন দ্বিগুণ পরিমাণ নতুন বালু তোলা হচ্ছে। প্রশাসনের চোখের সামনেই এই ওপেন সিক্রেট জালিয়াতি চললেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।


অভিযোগের তীর স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দিকে। স্থানীয়দের দাবি ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নেই শতাধিক অবৈধ বালুর পয়েন্ট চালু রয়েছে। তারমধ্যে আবুল হোসেন নামের এক ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রণেই চলছে অন্তত ৯টি বালুর পয়েন্ট। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী সরই ইউনিয়ন এখন অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের মূল অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সরইয়ের ডজন ডজন স্পটে প্রকাশ্যেই চলছে এই লুটপাট। বিশেষ করে সরই খাল, পুলু খাল, আন্ধারী খাল এবং হরি খালে ড্রেজার বসিয়ে নির্বিচারে বালি তোলা হচ্ছে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়ায় এই সিন্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া যে, দিনের আলো ফুরিয়ে রাতের আঁধার নামলেও থামে না ডাম্প ট্রাকের গর্জন। রাতভর শত শত ট্রাক বালু পরিবহনের কারণে গ্রামীণ সড়কগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে, আর নির্ঘুম রাত কাটছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।


সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্বিচারে বালু তোলার কারণে নদী ও ছড়ার তলদেশ অস্বাভাবিক নেমে গেছে। এতে সেতুর পিলার ও কালভার্টের নিচের মাটি সরে গিয়ে সেগুলো এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে সরকারের মেগা বাজেটের এই যোগাযোগ ব্যবস্থা। এছাড়া তীব্র ভাঙনে নদীপাড়ের কাঁচা-পাকা ঘরবাড়িগুলো ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। বিস্তীর্ণ ফসলি জমি হারিয়ে অনেক কৃষক এখন নিঃস্ব।


স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের চোখের সামনে ঘরবাড়ি আর রাস্তাঘাট শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকি দেওয়া হয়। নিলামের নামে মূলত অবৈধ বালু চুরির স্থায়ী লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।"


প্রশাসনের এই 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি' স্বভাবের কারণে ফাঁসিয়াখালীর পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের জীবন আজ বিপন্ন। অবিলম্বে টাস্কফোর্সের চিরুনি অভিযান এবং এই রাক্ষুসে বালু সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় না আনলে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা।


প্রতিদিনের বান্দরবান

সম্পাদক ও প্রকাশকের কার্যালয়ঃ
কপিরাইট © ২০২৬ প্রতিদিনের বান্দরবান । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত